এয়ারটেল এখন সার্কেল!
Airtel to Cirkle rebranding lessons to learn

১০০ মিলিয়ন ডলারের লোগো ৬ দিনেই ডাস্টবিনে ফেলেছিল Gap!
রিব্র্যান্ডিং একটা হাই-স্টেক্স গেম।
এয়ারটেলের Cirkle হয়ে ওঠার ভেতরের গল্পটা জানলে বুঝবেন রিব্র্যান্ডিং এর পেছনে তাদের স্ট্র্যাটেজি ও বিজনেস আর্কিটেকচার।
২০১৬ সালে যখন রবি আজিয়াটা ও এয়ারটেলের মার্জার হয়, তখন আজিয়াটা ৬৮.৭%, ভারতী এয়ারটেল ২৫% এবং এনটিটি ডোকোমো ৬.৩% স্টেক নিয়ে ছিল। বিটিআরসি তখনই স্পষ্ট শর্ত দিয়েছিল, মার্জড কোম্পানি শুধু 'রবি' নামে মার্কেট করবে। আর এয়ারটেলের ০১৬ সিরিজের সিম বিক্রির জন্য সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল মাত্র ২ বছর। কথা ছিল, এই ২ বছর পর নতুন করে আর কোনো ০১৬ নম্বর বিক্রি করা যাবে না এবং বিদ্যমান ০১৬ নম্বরের গ্রাহকদের ০১৮ সিরিজে কনভার্ট করে ফেলতে হবে।
চুক্তিতে বিটিআরসির অনুমোদন সাপেক্ষে সময়সীমা বাড়ানোর একটি সুযোগ রাখা হয়েছিল। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়েই প্রায় এক দশক ধরে এয়ারটেল আলাদা কনজ্যুমার ব্র্যান্ড হিসেবে টিকে ছিল। অবশেষে গত ১৭ আগস্ট প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে রবি আজিয়াটা তাদের এয়ারটেল ব্র্যান্ডকে পিছে ফেলে লঞ্চ করলো 'Cirkle'
তো, এই রিব্র্যান্ডিং কি শুধু একটা নাম আর লোগো বদল?
বিজনেস মডেল পিভট করলে, নতুন ডেমোগ্রাফি ধরতে গেলে বা ওউনারশিপ স্ট্রাকচার বদলে গেলে রিব্র্যান্ডিং আবশ্যক হয়ে যায়। ওউনারশিপ স্ট্রাকচার হিসেবে, এই রিব্র্যান্ডিং হওয়ার কথা ছিল ২০১৬ সালেই। বরং এতো বছর পর যে রবি রিব্র্যান্ডিং করছে, তা নিয়েও রয়েছে কম্পিটিটর প্রেশার 'এয়ারটেল' এর মত ব্র্যান্ড নেম ইউজ করার জন্য।
চলুন দেখা যাক, এই রিব্র্যান্ডিংয়ের পেছনের বিজনেস ফ্যাক্টরগুলো ডিকোড করে আমরা কী কী শিক্ষা নিতে পারি ইনশাআল্লাহ।
- রেগুলেটরি বাধ্যবাধকতা ও কম্পিটিটিভ ল্যান্ডস্কেপ
এয়ারটেল থেকে Cirkle-এ ট্রানজিশন শুধু কোনো ক্রিয়েটিভ ডিসিশন না। এর পেছনে ইক্যুইটি স্ট্রাকচার, রেগুলেটরি হিস্ট্রি আর কম্পিটিটর প্রেশার একসাথে কাজ করেছে। রবি আজিয়াটার টেলিকম পোর্টফোলিওতে ৩টি ব্র্যান্ড আছেঃ রবি - মাস্টার ব্র্যান্ড, এয়ারটেল - ইয়ুথ-ফোকাসড সাব-ব্র্যান্ড, Axentec - কর্পোরেট সল্যুশন্স
রেগুলেটরি প্রেশার ও নিজেদের স্ট্রাকচারকে সিমপ্লিফাই করতে রবি Cirkle-কে আগের ইয়ুথ-ফোকাসড পজিশনেই সাব-ব্র্যান্ড হিসেবে রিব্র্যান্ড করলো।
পজিশনিং, টার্গেট ডেমোগ্রাফি, ব্র্যান্ড কালারসহ ওভারঅল ভিজ্যুয়াল সিমিলারিটি রাখা হয়েছে, যাতে সাবকনশাসলি এটি এয়ারটেলের কথা মনে করিয়ে দেয়; যত কম সম্ভব কাস্টমারকে শক করা যায়।
এতে বুঝাই যায়, তারা মেজর রিব্র্যান্ডিং করছে না; যা করছে কিছুটা চাপে, কিছুটা প্রয়োজনে।
পাশাপাশি, এটি জিপির Skitto এবং বাংলালিংকের Ryze-এর সাথে রবির একটি স্ট্র্যাটেজিক রেসপন্স হতে পারে। টেলিকম মার্কেটে ডিজিটাল-ফার্স্ট ইয়ুথ সেগমেন্টে যেখানে এয়ারটেল এগিয়ে ছিল, নিজেদের পজিশনিংটা তারা আবারও রিক্লেইম করছে "ডিজিটাল এক্সপেরিয়েন্স ও ইয়ুথ-সেন্ট্রিক লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড" হিসেবে। যদিও Ryze এর edgy ব্র্যান্ডিংয়ের তুলনায় Cirkle এর ব্র্যান্ডিং বেশ এপ্রোচেবল রাখা হয়েছে।
- এয়ারটেলের ব্র্যান্ড ইক্যুইটি ও লেগাসি
অনেকের মনে হতে পারে মানুষ হয়তো এয়ারটেলকে অনেক মিস করবে এবং নতুন ব্র্যান্ড একসেপ্ট করতে সময় নেবে। কিন্তু এই নস্টালজিয়া শুধু আগের জেনারেশনগুলোর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। Cirkle-এর কোর টার্গেট ডেমোগ্রাফি হলো জেন জি ও জেন আলফা। সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং বিষয় হলো, জেন আলফাকে 'এয়ারটেল থেকে Cirkle ট্রানজিশন নতুন করে শিখতে হবে না। তারা বড়ই হবে Cirkle নামটির সাথে পরিচিত হয়ে। তাদের কাছে যদি ঠিকমতো পৌঁছাতে পারে, এটিই হয়ে উঠবে তাদের "Cirkle"
- দ্য হাই-স্টেক্স গেম অফ রিব্র্যান্ডিং
রিব্র্যান্ডিং শব্দটা শুনতে যতটা ফ্যান্সি, এর পেছনের রিয়েলিটি ঠিক ততটাই রুথলেস।
ধরা যাক, কোনো এক সকালে কোম্পানির বোর্ডরুমে রিব্র্যান্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলো। এটা এমন না যে আজ এজেন্সিকে ব্রিফ দেওয়া হলো আর সামনের মাসেই নতুন ব্র্যান্ড লঞ্চ হয়ে গেল। পর্দার আড়ালে একটি প্রপার রিব্র্যান্ডিং প্রজেক্ট দাঁড় করাতে ১২ থেকে ১৮ মাস পর্যন্ত ঘাম ঝরাতে হয়। আর এর পেছনে ঢালতে হয় কোম্পানির বার্ষিক মার্কেটিং বাজেটের ৫ থেকে ১০ শতাংশের মতো বিশাল এক অংক।
কিন্তু এত সময় আর টাকা ইনভেস্ট করার পর রেজাল্ট কী দাঁড়ায়? এখানেই আসে সবচেয়ে শকিং রিয়েলিটি। মার্কেটিংয়ের ডেটা বলছে, প্রায় ৪০ শতাংশ রিব্র্যান্ডিং ক্যাম্পেইনই দিনশেষে কোনো পজিটিভ ROI (রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট) এনে দিতে পারে না। আর রিব্র্যান্ডিংয়ের স্টোরিলাইন যদি অডিয়েন্সের সাথে কানেক্ট করতে ফেইল করে, তবে তা শুধু ব্র্যান্ড ইমেজই নষ্ট করে না, সরাসরি সেলস কমিয়ে দিতে পারে ২০ শতাংশ পর্যন্ত!
তাহলে কোম্পানিগুলো জেনেবুঝে এত বড় রিস্ক কেন নেয়?
কারণ গেমটা যদি ঠিকভাবে খেলা যায়, তবে রিওয়ার্ডও অনেক বড়। একটি কনসিস্টেন্ট ও স্ট্র্যাটেজিক ব্র্যান্ডিং কোম্পানির রেভিনিউ ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বুস্ট করতে পারে। এর পেছনের কনজ্যুমার সাইকোলজিটা খুব সিম্পল, ৮১ শতাংশ মানুষই কোনো ব্র্যান্ডের ওপর 'ট্রাস্ট' না এলে পকেট থেকে টাকা বের করার কথা ভাবেই না। রিব্র্যান্ডিং মূলত সেই ট্রাস্টটাকেই নতুন ডেমোগ্রাফির কাছে নতুন করে বিল্ড করার একটা মেকানিজম।
তাই ভুল সময়ে, ভুল অডিয়েন্সের জন্য বা স্রেফ 'লোগোটা পুরনো হয়ে গেছে' ভেবে রিব্র্যান্ড করা মানে সরাসরি আত্মঘাতী হওয়া।
- রিব্র্যান্ডিং ডিজাস্টার্স থেকে শিক্ষাগ্রহণ
- Gap (২০১০) — দ্য আনটোল্ড রিঅ্যাকশন
২০ বছরের পুরনো আইকনিক ব্লু-বক্স লোগো বদলে তারা হেলভেটিকা ফন্টের ওয়ার্ডমার্ক আর গ্রেডিয়েন্ট স্কয়ার নিয়ে আসে। কোনো অ্যানাউন্সমেন্ট বা স্টোরিলাইন ছিল না। ২৪ ঘন্টার মধ্যে ২০০০-এর বেশি নেগেটিভ কমেন্ট আসে এবং একটি প্যারোডি টুইটার অ্যাকাউন্টে ৫০০০ ফলোয়ার্স যুক্ত হয়। প্রায় ১৪০০০ স্পুফ লোগো ভাইরাল হওয়ার পর মাত্র ৬ দিনের মাথায় Gap তাদের পুরনো লোগোতে ফিরে যেতে বাধ্য হয়। পুরো রিব্র্যান্ডিং রিভার্স করতে হয়। ১০০ মিলিয়ন ডলারের লোগো ৬ দিনেই ডাস্টবিনে!
- Jaguar (২০২৪) — দ্য লেগাসি ক্রাইসিস
"Copy Nothing" ক্যাম্পেইন নিয়ে এসে তারা নিজেদের ৩০ সেকেন্ডের অ্যাডে একটি নন-বাইনারি মডেলকে দেখায় এবং "Live Loud" স্লোগান ব্যবহার করে। লেগাসি কাস্টমাররা তীব্র প্রতিবাদ জানায়। ব্র্যান্ডের ১০০ বছরের হেরিটেজ, লাক্সারি আইডেন্টিটি আর পারফরম্যান্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সাথে এই নতুন ক্যাম্পেইনের কোনো মিল ছিল না। পাবলিক রিঅ্যাকশন এতোটাই খারাপ ছিল যে মুহূর্তেই ব্র্যান্ডের মার্কেট ভ্যালু ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
- রিব্র্যান্ডিং সাকসেস থেকে শিক্ষাগ্রহণ: যেগুলো মাথায় রেখে করা উচিত
- Kia (২০২১) — দ্য পারফেক্ট পিভট
লোগো, ট্যাগলাইন আর গ্লোবাল ব্র্যান্ড আইডেন্টিটি সম্পূর্ণ রিডিজাইন করে তারা "Movement that inspires" ট্যাগলাইন নিয়ে আসে এবং ইলেকট্রিক ভেহিকল (EV) মার্কেটে নিজেদের পজিশনিং ক্লিয়ার করে। নতুন আইডেন্টিটি তাদের ইভি ট্রানজিশনের সাথে পুরোপুরি অ্যালাইনড ছিল বলে কাস্টমারদের কাছে তা অথেনটিক মনে হয়। ফলাফলস্বরূপ, ২০২১ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত তাদের গ্লোবাল সেলস ৫০% বেড়ে যায়।
- Burberry (২০২৩) — হেরিটেজ মিটস মডার্নিটি
১২৪ বছরের পুরনো নাইট লোগো বদলে একটি মিনিমাল, মনোগ্রাম-বেসড আইডেন্টিটি নিয়ে আসে তারা। নতুন সিইও জোশুয়া শুলম্যানের লিডারশিপে ব্র্যান্ডকে লাক্সারি রিটেইল থেকে লাক্সারি লাইফস্টাইল ব্র্যান্ডে ট্রান্সফর্ম করা হয়। ভিজ্যুয়াল আইডেন্টিটি তাদের ডিজিটাল-ফার্স্ট স্ট্র্যাটেজির সাথে মিলে যায়, ফলে ২০২৪ সালে রেভিনিউ ১৮% বেড়ে যায়। ব্র্যান্ড আর্কিটেকচার বদলালেও তাদের কোর ভ্যালু ঠিক ছিল, যা নতুন অডিয়েন্সের সাথে দারুণভাবে কানেক্ট করেছে।
শেষ কিছু কথা-
পরেরবার যখন নিজের বিজনেসের জন্য রিব্র্যান্ডিংয়ের কথা ভাববেন, অথবা কোনো ক্লায়েন্ট এসে বলবে "আমরা রিব্র্যান্ড করছি", তখন প্রথম প্রশ্নটি করুন: "কেন?"
যদি উত্তর হয় "লোগোটা পুরনো হয়ে গেছে", তাহলে বুঝতে হবে সেখানে একটি ব্র্যান্ড রিফ্রেশ দরকার, রিব্র্যান্ড নয়। কিন্তু যদি উত্তর হয় "আমাদের বিজনেস মডেল, ওউনারশিপ, টার্গেট অডিয়েন্স আর রেগুলেটরি রিয়েলিটি পুরোপুরি চেঞ্জ হয়ে গেছে", তবেই রিব্র্যান্ডিং অপরিহার্য।
লোগো বদলাতে একটা প্রেস কনফারেন্স লাগে। কিন্তু ব্র্যান্ড আর্কিটেকচার বদলাতে লাগে দশকের রেগুলেটরি ফাইল, তিনটি কোম্পানির অভিযোগ আর একটি মার্জার এগ্রিমেন্টের ফাইন প্রিন্ট।
Cirkle-এর ব্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজি শেষ পর্যন্ত কতটা সফল হবে বা এর অ্যাক্টিভেশন ক্যাম্পেইন মার্কেট ধরতে পারবে কি না, তা আগামী কয়েক বছর পরই বোঝা যাবে। কারণ দিনশেষে উদ্যোক্তা বা ব্র্যান্ড প্র্যাক্টিশনার হিসেবে আমরা যা-ই বলি না কেন, ব্র্যান্ডিংয়ের সেই অমোঘ নিয়মটিই সত্য:
"ব্র্যান্ড সেটা নয় যা কোম্পানি নিজে দাবি করে, ব্র্যান্ড হলো ঠিক সেটাই যা সাধারণ মানুষ ওই ব্র্যান্ড সম্পর্কে বলে।"
-মার্টি নিউমেইয়ার