Sadman Saqib Sifat Writings
4 min read

কয়েক ডলারের লোভে নিজের ভাইয়ের পিঠে ছুরি?

কারো রক্তের বিনিময়ে বা কারো ক্ষতি করে আপনি লাভবান হচ্ছেন, এটাই কি আপনার কাছে সফলতা?

হ্যাঁ, বস্তুবাদী দুনিয়া তো আজকাল আমাদের সেটাই শেখায়! চারপাশে তাকালে মনে হয় একটাই উদ্দেশ্য, যেভাবেই হোক টাকা ইনকাম করো। টাকা কোথা থেকে আসছে আর কিভাবে আসছে, সেটা কোনো ব্যাপারই না। নীতি নৈতিকতা বিক্রি করে দিয়ে হলেও পকেট ভারী করাই যেন আধুনিক যুগের স্মার্টনেস।

একটা বেশ অস্বস্তিকর ও বাজে বিষয় নিয়ে একটা ভিডিও ডকুমেন্টারি দেখলাম। সেখান থেকেই আজকের এই লেখা। আমরা ভাবি হালাল উপার্জন মানে কেবল সুদের ব্যবসা না করা বা ওজনে কম না দেওয়া। কিন্তু বিষয়টির ব্যাপ্তি আরও অনেক গভীরে।

বর্তমান যুগে ইনকামের সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম হয়ে উঠেছে কন্টেন্ট ক্রিয়েশন। আর এই কন্টেন্ট বানিয়ে টাকা কামানোর লোভে মানুষ কতটা নিচে নামতে পারে, তার একটা ভয়ংকর চিত্র আমরা সম্প্রতি দেখছি এআই কন্টেন্ট ক্রিয়েশন ক্যাশগ্র্যাব দিয়ে।

শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম, ফিলিপিন্স এবং সম্ভবত বাংলাদেশ, ভারত বা পাকিস্তানের মতো দেশের কিছু মানুষ ঘরে বসে ইউকে, ইউএসএ বা অস্ট্রেলিয়ার মতো পশ্চিমা দেশগুলোকে টার্গেট করে কন্টেন্ট বানাচ্ছে। সে তো ভালো কথা। কিন্তু কন্টেন্টগুলো কিসের?

ইমিগ্র্যান্ট বা অভিবাসীদের বিরুদ্ধে চরম বিদ্বেষমূলক উসকানিমূলক ভিডিও এবং ভুয়া নিউজ। পশ্চিমা বিশ্বে ইমিগ্র্যান্টদের নিয়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা কতটা গুরুতর, সে বিষয়ে অনেকেই হয়তো অবগতও নন।

ওই ডকুমেন্টারিতে দেখানো হয়েছে, একজন শ্রীলঙ্কান শুধু টাকা ইনকাম করার জন্য এআই ব্যবহার করে রেসিস্ট কন্টেন্ট বানাচ্ছে এবং অন্যদেরও তা শেখাচ্ছে। সে নিজে বিলাসবহুল জীবনযাপন করছে, আর তার অনুসারীরা জাকারবার্গকে ধন্যবাদ জানাচ্ছে এমন আয়ের সুযোগ তৈরি করার জন্য! বুঝে হোক বা না বুঝে, তারা মূলত পশ্চিমা ওই দেশগুলোর র‍্যাডিক্যাল হোয়াইট সুপ্রিমেসিস্টদের রাগ উসকে দিয়ে বেশি রিচ আনছে আর মনিটাইজেশনের ডলার ছাপাচ্ছে।

একবার ভেবে দেখুন, তারা কাদের ক্ষতি করছে? পশ্চিমা বিশ্বে যে ইমিগ্র্যান্টদের বিরুদ্ধে তারা ঘৃণা ছড়াচ্ছে, তারা কারা? তাদের একটা বড় অংশ কিন্তু আমরা সাউথ এশিয়ানরাই। আমাদেরই ভাই, আত্মীয়, কিংবা অন্তত আমাদের অঞ্চলেরই মানুষ, যারা সেখানে একটু ভালো জীবনের আশায় বা পেটের দায়ে পাড়ি জমিয়েছে।

কয়েকটা ডলার, একটু বেশি সিপিএম বা আরপিএমের লোভে নিজের জাতের মানুষের পিঠেই ছুরি মারতে এদের বুক কাঁপছে না। নিজের পকেট ভারী করার জন্য এমন ঘৃণা ছড়ানো হচ্ছে, যার ফলে হয়তো কোনো নিরীহ ইমিগ্র্যান্ট হামলার শিকার হচ্ছে বা পলিসি পরিবর্তনের কারণে বিপদে পড়ছে। এক্স প্ল্যাটফর্মেও আফ্রিকানদের একটা অংশ টাকার লোভে এমন রেসিস্ট কন্টেন্ট বানাচ্ছে বলে আরেকটা ডকুমেন্টারিতে দেখেছিলাম। কারো রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই টাকা কি কখনো হালাল হতে পারে?

কারো ক্ষতি করে, কারো পিঠে পা দিয়ে অর্জিত সাফল্য আসলে সাফল্য নয়, ওটা এক ধরণের ধীরগতির বিষ। যে উপার্জনে অন্যের চোখের জল জড়িয়ে থাকে, সেই টাকা ঘরে বরকত আনতে পারে না; আনে শুধু অশান্তি আর মানসিক নিঃস্বতা। ওলামায়ে কেরামের সর্বসম্মত মত অনুযায়ী এমন ঘৃণা ছড়িয়ে কন্টেন্ট বানিয়ে ইনকাম করা সম্পূর্ণ হারাম। আপনি সত্যিকারের মুমিন হলে হারাম উপায়ে বিদ্বেষমূলক কন্টেন্ট বানিয়ে সস্তা ভিউ কুড়ানো এবং সেই সন্দেহজনক টাকা দিয়ে পরিবারের পেট চালানো আপনার ঈমানী দায়িত্বের পরিপন্থী।

অনলাইনে ইনকাম করার সহজ বিষয়টাকে আজ কত বাজে পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে! বাংলাদেশেও এখন শুধু নিজের ছবি দিয়ে গুড মর্নিং বা গুড নাইট টাইপের পোস্ট করে স্টার গিফটিং কালচারের মাধ্যমে টাকা আয়ের একটা ট্রেন্ড চোখে পড়ছে। কোনো ভ্যালু প্রোভাইড না করেই কেবল মনিটাইজেশন বা স্টার্স থেকে টাকা হাতানোর জন্য মানুষ মরিয়া। ভাইরাল হওয়ার নামে কে কত নিচে নামতে পারে, সেই অসুস্থ প্রতিযোগিতার কথা আর নাই বা বললাম। আর মেটার মতো কোম্পানিগুলো তাদের নিজস্ব লাভের জন্য এগুলোতে আরও ঘি ঢালছে।

এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে অভাবে স্বভাব নষ্ট তত্ত্ব। অনেকেই বলতে পারেন, ওরা গরিব, অস্বচ্ছল, তাই পেটের দায়ে অসদুপায় অবলম্বন করছে। মুমিনদের জন্য ইসলামের দিক থেকে এটা কোনোভাবেই সাপোর্ট করা যায় না; আর অমুসলিমদের জন্যেও নৈতিক দিক দিয়ে এটাকে পজেটিভভাবে দেখার কোনো উপায় নেই। ইসলাম তো বলে, দুনিয়াতে যে গরিব বা অস্বচ্ছল থাকবে, তার হিসাব ততটাই সহজ হবে। সে যদি সবর করে এবং সৎকর্ম করে, তবে তার জন্য জান্নাতে যাওয়া অনেক সহজ।

অন্যের রক্ত শুষে, সমাজে ঘৃণা ছড়িয়ে ইনকাম করা যে চরম অন্যায়, তা বুঝতে নিশ্চয়ই কারো মহামানব হতে হয় না। আর ইনকাম মানেই যে কেবল অনলাইনে কন্টেন্ট বানিয়েই করতে হবে, এমন তো কোনো কথা নেই। কন্টেন্ট ক্রিয়েশনের এই অসুস্থ প্রতিযোগিতায় না নেমে, আপনার স্কিলসেট ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ছোট পরিসরে হালাল কোনো ব্যবসাও তো শুরু করতে পারেন!

ইসলাম হালাল ব্যবসাকে একটি উৎকৃষ্ট ইবাদত হিসেবে ঘোষণা করেছে। কিন্তু সেই ব্যবসার শর্ত একটাই, তা হতে হবে স্বচ্ছ, কল্যাণকর এবং অন্যের ক্ষতিমুক্ত। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা পবিত্র কুরআনে সূরা আল বাকারার ২৭৫ নম্বর আয়াতে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম।

অন্যদের ক্ষতি না করে সততার সাথে ব্যবসা করার মর্যাদা কতো বড়, তা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর একটি হাদিস দেখলেই বোঝা যায়। তিনি বলেছেন, বিশ্বস্ত ও সত্যবাদী ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন নবীগণ, সিদ্দিকীন এবং শহীদগণের সাথে থাকবেন। (জামে আত তিরমিজি ১২০৯)

চিন্তা করে দেখুন, কত বড় সম্মান! সমাজকে বিষাক্ত না করে, সঠিক পণ্য বা সেবা পৌঁছে দিয়ে মানুষের উপকার করার এই সাধারণ সততাই আপনাকে হাশরের ময়দানে বিশ্বনবী ও শহীদদের পাশে দাঁড় করিয়ে দিতে পারে।

দুনিয়া হয়তো আপনাকে শেখাবে যেভাবে পারো বড়লোক হও। কিন্তু আখেরাত আপনাকে মনে করিয়ে দেবে যেকোনো উপায়ে অর্জিত একশ টাকা নয়, বরং হালাল উপায়ে অর্জিত দশ টাকাতেই আসল শান্তি ও বারাকাহ।

তাই কন্টেন্ট বানিয়ে ঘৃণা ছড়িয়ে সস্তা মনিটাইজেশনের পেছনে না ছুটে নিজের দক্ষতা বাড়ান। সত্য ও সততার ওপর ভিত্তি করে হালাল উপায়ে ব্যবসা দাঁড় করান। মনে রাখবেন, অনাহারে মরে যাওয়া কোনো মুমিনের ইতিহাস নেই, কিন্তু হারাম খেয়ে বরবাদ হয়ে যাওয়ার ইতিহাস অজস্র।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে হালাল ও পবিত্র উপার্জনের তৌফিক দান করুন।

আমিন।